নকল নেইমারের দেখা বাইরে, মাঠে হেক্সা জয়ের অপেক্ষায় আসল নেইমার

|

আলমগীর স্বপন, রোস্তভ, রাশিয়া থেকে

হঠাৎ দেখলে মনে বিভ্রমে পড়তে হবে। নেইমার তার সুরক্ষিত প্রশিক্ষণের ডেরা ছেড়ে মস্কোর ভনুকোভা বিমানবন্দরে কি করছে ? তাও আবার বিশ্বকাপের হেক্সা জয়ের মিশনের প্রথম ম্যাচের আগে!। না, কাছে যেতেই ভুল ভাঙ্গল। প্রায় একই মুখের গঠন ও নাকের গড়ন। টুপি ব্যবহারের স্টাইলে পার্থক্য নেই একেবারে। তবে এসবে পার্থক্য না থাকলেও হলুদ জার্সি পরিহিত মানুষটি আসলে নেইমার না! ব্রাজিলের সাওপাওলো থেকে আরও অনেকের সাথে রাশিয়ায় আসা তরুনের নাম ওয়ালেস।

মস্কো থেকে প্রায় হাজার মাইল দূরের শহর রোস্তভের পথে ভনুকোভা বিমানবন্দরে একদল ব্রাজিলিয়র মাঝে তার দেখা। এই দলে আছেন জোয়াও, দিবুরা, ম্যাথিয়াসও। নিজ দেশের বিশ্বকাপে চার বছর আগে ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে মন ভেঙ্গেছিলো ব্রাজিলিয়ানদের। এবার তারা আশাবাদী। কারণ গতবারের চেয়ে তরুণ এবং স্ট্রাইকিং, মিডফিল্ড এবং ডিফেন্স সব বিভাগেই ব্যালেন্স এবার সাম্বার দেশের দল ব্রাজিল। খেলায়ও ফিরে এসেছে চিরায়ত সৌন্দর্য। এ কারণে নেইমাররুপি ওয়ালেসের কণ্ঠে বিশ্বকাপ জয়ের সদম্ভ উচ্চারণ।

ওয়ালেসের ধারণা প্রথম ম্যাচে কমছে কম তিন গোলে সুইজারল্যান্ডকে হারাবে ব্রাজিল। এমনকি ওয়ালেস জানালো, কে কে গোল করবেন তাদের নামও। তার মতে, নেইমার অবশ্যই গোল করবে। গোলদাতার তালিকায় থাকবে জেসুস ও কুতিনহোর নামও। ব্রাজিলের জয় হবে এরকম আশা রোস্তভে আসা সব ব্রাজিলিয়ানদের।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে রাশিয়ার দক্ষিণের ইউক্রেন ও জর্জিয়া সীমান্তবর্তী রোস্তভের ডন নদীর তীর ঘেষে নির্মিত হয়েছে স্টেডিয়াম। বিমানবন্দরটিও নতুন। সেখান থেকে পথ চিনে রোস্তভ ডন স্টেডিয়ামে আসতে একটু সময় লাগলেও ঝক্কি বেশি একটা নেই। সাত সকালেই পৌঁছে যাই স্টেডিয়ামের কাছে। আমাদের সাথে কিছু ব্রাজিলিয়ানও হাজির স্টেডিয়ামে। বিভিন্ন গেটে প্রহরী, স্বেচ্ছাসেবক দাঁড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশ থেকে আসায় তারা সাদরে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেন। আর ব্রাজিলিয়দের বললেন, ‘তোমাদের অপেক্ষাতেই আমাদের যত আয়োজন। তবে ম্যাচ স্থানীয় সময় রাত নয়টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১২ টা) হওয়ায়, এই সময়টায় শহর ঘুরে আসার পরামর্শ দিলেন। স্টেডিয়াম থেকে প্রায় দেড় দুই হাজার গজ দূরে স্রোতস্বিনী ডন নদী। এর উপরের সেতু দিয়ে যখন আমরা হেঁটে শহরের দিকে যাচ্ছিলাম তখন এক পশলা হলকা বাতাসে উড়ে যাওয়ার যোগার আমাদের।

পথে পথে ব্রাজিলিয়দের সাথে দেখা। নিজ দেশের ফুটবল টিমের বিখ্যাত হলুদ জার্সি, হলুদ-সবুজের বাহারী টুপি ও  পতাকা গায়ে শহরে ঘুরছে তারা। কেউ কেউ পথের ধারের খাবারের দোকানে ভিড় করছেন। এই পথেই এক খাবারের রেঁস্তোরায় আবারও দেখা নেইমাররুপী সেই ওয়ালেস ও তার দলের সাথে। আমাদের দেখে তার মুখের হাসি চওরা হলো। ‘হ্যালো বাংলাদেশ’ বলে কাছে এসে হাত মিলালো। এবার তার হাতে আমাদের গৌরবের লাল সবুজের পতাকা তুলে দিলাম। সে ও তার দল বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ছবি তুললো। ওয়ালেস জানালো, বাংলাদেশে বাড়িতে বাড়িতে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানোর তথ্য। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সেই ঋণ শোধের চেয়ে শ্রদ্ধা ঝরে পরলো তাদের চোখেমুখে। এর মাঝে আবারও ফুটবলের আলাপ।

এবার জোয়াও এর কাছে জানতে চাই বিশ্বকাপ নিয়ে তার প্রত্যাশা। বলেন, ‘নিজ দেশে ৭-১ গোলের পরাজয় অবিশ্বাস্য ছিলো। তাই এবার প্রথম লক্ষ্য সেমিফাইনাল। যদিও এবার আমাদের টিম অনেক ভালো। তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে পাশে থাকা বান্ধবী দিবুরা উচ্চকন্ঠে বললেন, ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতার জন্যই এসেছে। 

ব্রাজিলিয়ানদের এই আকাঙ্ক্ষা কথা জানা আছে সুইসদেরও। প্রথম ম্যাচে নিয়ে এর আগে রোস্তভ বিমানবন্দরে কথা হয়েছিলো সুইজারল্যান্ডের জুরিখের ক্লদিওর সাথে। ব্রাজিল-জার্মানির সেই ৭-১ গোলের ম্যাচটি মাঠে বসে দেখেছিলেন তিনি। মতামত জানাতে গিয়ে টানলেন সেই প্রসঙ্গ। বললেন, ভালো দলের সাথে সুইস ফুটবল টিম সব সময় ভালো খেলে, তাই ব্রাজিলকে ছেড়ে কথা বলবে না জের্দান শাকিরির টিম। ভালো খেলে আইসল্যান্ড যেমন আটকে দিয়েছে আর্জেন্টিনাকে, একই ফল ব্রাজিলের বিপক্ষে ঘটবে আমরা আশা করছি । যদিও ক্লদিও মনে করে এবার ব্রাজিল হটফেভারিট। এর সাথে দ্বিমত না করে পাশে থাকা তার বান্ধবী আরসু বলেন, ব্রাজিল হটফেভারিট হতে পারে। কিন্তু সুইজারল্যান্ডও ফেভারিট। 

যখন চলছিলো এসব আলাপ তখন নিরপেক্ষ হিসেবে কথা হয় রাশিয়ার রোস্তভবাসী মিখাইলভের সাথে। তার ঘরের মাঠেই ব্রাজিল-সুইজারল্যান্ড ম্যাচ। এই ম্যাচ নিয়ে তাদের দীর্ঘ আট বছরের আকাঙ্ক্ষা। স্বাগতিক হিসেবে আট বছর আগে নাম ঘোষণা থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়েছে তাদের। নির্মাণ করা হয়েছে নতুন স্টেডিয়াম। আর সেই স্টেডিয়ামে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতে কোন দল ইতিহাস গড়বে?  মিখাইলোভের বাজি অবশ্য ব্রাজিলের পক্ষেই।  নিশ্চয়ই মাঠে সেই বাজি জেতার জন্য মুখিয়ে আছেন নেইমার। আর গ্যালারিতে উল্লাসে মাতার অপেক্ষায় আছেন নেইমাররুপী ওয়ালেসসহ হাজারো ব্রাজিলিয়ান। ব্রাজিল প্রথম ম্যাচ জিতলে সেই উচ্ছাসে ভাসবে বঙ্গোপসাগরের পাড়ের বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের লাখো কোটি ব্রাজিল ভক্তরা।









Leave a reply