চারণকবি বিজয় সরকারের ৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

|

রিফাত-বিন-ত্বহা,নড়াইল

এই পৃথিবী যেমন আছে/ তেমনিই ঠিক রবে/ সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে…। এই গানের রচয়িতা অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুরস্রষ্টা চারণকবি বিজয় সরকারের ৩৩ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ মঙ্গলবার। বার্ধ্যকজনিত কারণে ১৯৮৫ সালের এই দিনে তিনি কলকাতায় পরলোকগমন করেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কেউটিয়ায় তাকে সমাহিত করা হয়।

বিজয় সরকার ১৩০৯ বঙ্গাব্দের ৭ ফাল্গুন নড়াইলের নিভৃতপল্লী ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম নবকৃষ্ণ অধিকারী ও মা হিমালয়া দেবী। বিজয় সরকারের দুই স্ত্রী-বীণাপানি ও প্রমোদা অধিকারীর কেউই বেঁচে নেই। সন্তানদের মধ্যে কাজল অধিকারী ও বাদল অধিকারী এবং মেয়ে বুলবুলি অধিকারী ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছেন। বিজয় সরকারের প্রকৃত নাম বিজয় অধিকারী। সঙ্গীত সাধনার জন্য তিনি ‘সরকার’ উপাধি লাভ করেন। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।

বিজয় সরকারের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিজয় সরকার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে আজ থেকে দু’দিনব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বিজয় সরকার কবিগান গেয়ে যে টাকা উর্পাজন করতেন, তা মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। তাই ‘কণ্ঠযোদ্ধা’ হিসেবে বিজয় সরকারকে ‘স্বাধীনতা পদক’ দেয়ার দাবিসহ জাতীয় চারণকবির স্বীকৃতি প্রদান, বিজয় সরকারের নামে নড়াইলে ফোকলোর ইন্সটিটিউট নির্মাণ এবং পাঠ্যপুস্তকে কবির রচনা ও জীবনী অন্তর্ভূক্ত করার দাবি উঠেছে। মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার সুরস্রষ্টা চারণকবি বিজয় সরকারের বসতভিটা এখন সংরক্ষণের অভাবে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।

২০০৯ সালে জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বিজয় সরকারের বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার ডুমদিতে ভবন ও বিজয় মঞ্চ নির্মিত হলেও অযত্ন অবহেলায় তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রায় ৮ বছর আগে ছোট্ট পরিসরে বসতভিটায় বিজয় মঞ্চ নির্মিত হলেও দেখার কেউ নেই। নেই টিউবওয়েল ও টয়লেট ব্যবস্থা। সম্প্রতি বিদ্যুৎসংযোগ পেলেও বিজয় মঞ্চের বেহালদশা। মেঝের টাইলস ভেঙ্গে গর্ত হয়ে গেছে। ভেঙ্গেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে এই ভবনটির বেশিরভাগ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে কবির ব্যবহৃত খাটসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংগ্রহশালা নির্মাণের দাবিও রয়ে গেছে উপেক্ষিত।

বিজয় সরকারের বাড়িতে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটিও আজো সম্পূর্ণরূপে পাঁকা হয়নি। প্রায় দুই কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার কারণে দর্শনার্থীরা পড়েন বিপাকে। ছয় মাসের বেশি সময় নৌকার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এদিকে, নড়াইলের আনাচে-কানাচে বিজয় সরকারের গান চর্চা হলেও স্বরলিপির অভাব রয়েছে।

প্রকৃত নাম বিজয় অধিকারী হলেও সুর, সঙ্গীত ও অসাধারণ গায়কী ঢঙের জন্য ‘সরকার’ উপাধি লাভ করেন। বিজয় সরকার একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক ছিলেন। ১৮০০ বেশি গান লিখেছেন এবং সুর ও সঙ্গীত করেছেন। তিনি গানের কথায়, সুরের মাঝে বেঁচে আছেন হাজারো মানুষের হৃদয়ে। বিজয় সরকারের গানগুলো আজো মানুষের মুখে মুখে সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে দেয়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার কবি বিজয় সরকার গেয়েছেন-নবী নামের নৌকা গড়/ আল্লাহ নামের পাল খাটাও/ বিসমিল্লাহ বলিয়া মোমিন/ কূলের তরী খুলে দাও…। কিংবা আল্লাহ রসূল বল মোমিন/ আল্লাহ রসূল বল/ এবার দূরে ফেলে মায়ার বোঝা/ সোজা পথে চল…।

স্ত্রী বীনাপাণির মৃত্যুর খবরে গানের আসরেই গেয়েছেন-পোষা পাখি উড়ে যাবে সজনী/ ওরে একদিন ভাবি নাই মনে/ সে আমারে ভুলবে কেমনে…। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন এর ‘নক্সী কাথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থের নায়ক-নায়িকা ‘রূপাই’ ও ‘সাজু’র প্রেমকাহিনী নিয়ে বিজয় সরকার গেয়েছেন-নক্সী কাঁথার মাঠেরে/ সাজুর ব্যাথায় আজো রে বাজে রূপাই মিয়ার বাঁশের বাঁশি…। কী সাপে কামড়াইলো আমারে/ ওরে ও সাপুড়িয়ারে/ আ…জ্বলিয়া পুড়িয়া মলেম বিষে…। প্রিয়জনের কথা স্মরণ করে লিখেছেন-তুমি জানো নারে প্রিয়/ তুমি মোর জীবনের সাধনা…।

বিজয় সরকারের আত্মীয়-স্বজনরা জানান, কবির বসতভিটা এলাকায় বর্তমানে আমার পরিবারই বসবাস করছে। অন্যরা ডুমদি ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন অনেক আগেই। কবির বসতভিটা এবং বাসভবন দেখার কেউ নেই। মেঝের টাইলস ভেঙ্গে গর্ত হয়ে গেছে। ভেঙ্গেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে এই ভবনটির বেশেরভাগ অংশ। খুবই এলোমেলো অবস্থা। থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। রয়েছে টয়লেট ও পানির সমস্যা। তাই দেশ-বিদেশের দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান।

চারণকবি বিজয় সরকার ফাউন্ডেশনের যুগ্ম-আহবায়ক এসএম আকরাম শাহীদ চুন্নু বলেন, কবিয়াল বিজয় সরকার বাংলার গর্ব। তাকে নিয়ে দুই বাংলায় কাজ শুরু হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বিজয় সরকারের অবদান রয়েছে।









Leave a reply