আকাশের আত্মহননে ডা. মিতুর মিডিয়া ট্রায়াল নয়, ৪৯ বিশিষ্টজনের বিবৃতি

|

চট্টগ্রামে চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যার ঘটনায় স্ত্রী ডা. তানজিলা হক চৌধুরী মিতু যেনো মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার না হয়। আদালতের মাধ্যেমে বিচার করা যেনো হয়। মঙ্গলবার (১২ ফেব্রুয়ারি) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, লেখক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, নারী অধিকার কর্মী, সাবেক ছাত্রনেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ ৪৯ জন পেশাজীবী এই বিষয়ে লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন

বিবৃতিতে বলা হয়, গভীর উদ্বেগের সাথে আমরা লক্ষ্য করছি যে, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯ চট্টগ্রামে সংগঠিত হওয়া চিকিৎসক মোস্তফা মোরশেদ আকাশের আত্মহত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচণ্ড বিদ্বেষ ও ঘৃণা উদ্রেগকারী বক্তব্য প্রকাশিত হচ্ছে। যার নির্মম শিকার হচ্ছেন আকাশের স্ত্রী চিকিৎসক তানজিলা হক চৌধুরী মিতু এবং তার পরিবার, যা বিচারাধীন এই ঘটনাটিকে ‘মিডিয়া-ট্রায়াল’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি যে, আকাশের আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে পূর্বানুমানের ভিত্তিতে সমাজের গৎবাঁধা দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করে মিতুকে অভিযোগ করার ঘটনা ব্যাপক হারে ঘটছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও সেই একই প্রবণতা দ্বারা পরিচালিত হয়ে মামলা হওয়ার আগেই আইন বহির্ভূতভাবে মিতুকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীকে রিমান্ডে নিয়েছে, যা উদ্বেগজনক।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’র (হু) তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন আত্মহত্যা করছে, যা কোনভাবেই আমরা সমর্থন করতে পারি না। আমরা সমাজে এই বাস্তবতা দেখছি যে, একটি মানসিক পরিস্থিতিতে কেউ আত্মহত্যা করেন আবার বেশীরভাগ মানুষ সেই একই পরিস্থিতিতে বা তারচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে পড়েও আত্মহত্যা করে না। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন মানবিক এবং সামাজিক সম্পর্কের নতুন ধারা এবং মাত্রা আমাদের সমাজে প্রবেশ করেছে। সারা বিশ্বেই মানুষ এখন অপর মানুষের সাথে সম্পর্কের মাত্রা নিজে নির্ধারণ করাকে অধিকার ভাবছে। এটা অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। এজন্য আত্মহত্যার দায় অন্যকে দেওয়া এবং প্ররোচনার জন্য অভিযুক্ত করার বিষয়টি অত্যন্ত সচেতনভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন যেনো আত্মহত্যা করা ইতিবাচক হিসাবে প্রতিফলিত না হয়। কে কোন পরিস্থিতিতে চরম হতাশ হয়ে জীবনকে অর্থহীন মনে করবে তা বলা মুশকিল। তবে যাদের এই ধরণের প্রবণতা থাকে পরিবারের সদস্যরাই সর্বাগ্রে তা বুঝতে পারে। তাই তাদের মানসিক শক্তি যোগানো, জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করা পরিবারের সদস্যদের কাজ৷বিষয়টির সার্বিক সমাধানে সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনও জরুরী।

পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণ অমূল্য এবং প্রতিটি মানুষের ন্যায় বিচার পাবার অধিকার রয়েছে, তাই আমরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, অপরাধ প্রমাণিত হবার আগেই আকাশের আত্মহননের দায় যেনো কিছুতেই অন্যায্যভাবে মিতুর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে মিতুকে এবং তার পরিবারকে লোকলজ্জা ও সামাজিক চাপের মধ্যে ফেলা না হয়। কেননা, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হ্ওয়ার আগে অন্যায়ভাবে কাউকে দায়ী করে তার কাঁধে দোষ চাপানো হলে সেটিও অবিচার হবে এবং সেখানেও লংঙ্ঘিত হবে মানবাধিকার।

পুনশ্চ: একজন তরুণ চিকিৎসকের করুণ আত্মহনন আমাদেরকে ব্যথিত করে। ভবিষ্যতে আর কেউই যেন কোনো পরিস্থিতিতেই আত্মহননের পথ বেছে না নেয় সেই লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের তরফে সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেয়া দরকার বলেও আমরা অনুভব করছি।

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা হলেন- সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক, মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী সারা হোসেন, লেখক রেহনুমা আহমেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্বাধীন সেন, অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস, অধ্যাপক আইনুন নাহার, অধ্যাপক ফাহমিদুল হক, আইনজীবী জোতির্ময় বড়ুয়া, হাসনাত কাইয়ুম, রাবির বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌভিক রেজা, ঢাবির সহযোগী অধ্যাপক কামাল চৌধুরী, জাবিরসহযোগী অধ্যাপক নাসরীন খন্দকার, সহযোগী অধ্যাপক পারভীন জলী প্রমুখ।









Leave a reply